যশোর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা বিভাগে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক ও গুরুত্বপূর্ণ শহর। প্রশাসনিকভাবে শহরটি যশোর জেলা এবং যশোর সদর উপজেলার সদরদপ্তর। এটি যশোর জেলার সবচেয়ে বড় এবং প্রধান শহর। এটি খুলনা বিভাগ এর অন্যতম বৃহত্তম ও জনবহুল শহর এবং প্রতিষ্ঠাকালের দিক থেকে দেশের প্রাচীন পৌরসভার একটি। যশোর খুলনা বিভাগের প্রধান বাণিজ্যিক শহর। যশোর বিমানবন্দর রাজধানী ঢাকার সাথে শহরটিকে আকাশপথে সংযুক্ত করেছে। বিভাগীয় শহর খুলনা থেকে যশোর শহরের দূরত্ব ৫২.২ কি.মি.।যশোর শহর ভৈরব নদ এর তীরে অবস্থিত। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান যশোরকে ফুলের রাজধানী বলা হয় কেননা যশোরের গদখালি থেকে বাংলাদেশের ৮০% ফুল সরবরাহ করা হয়।বাংলাদেশের সব থেকে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল যশোরে অবস্থিত। দক্ষিণাঞ্চলের দুই বিভাগ খুলনা ও বরিশালের একমাত্র পাঁচ তারকা হোটেল যশোরে অবস্থিত, দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও প্রাচীনতম সেনানিবাসের একটি যশোরে অবস্থিত, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী একাডেমি যশোরের মতিউর রহমান বিমান ঘাঁটিতে অবস্থিত, রয়েছে প্রাচীনতম রেলব্যবস্থা, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল আধুনিক সুযোগ সুবিধা। যশোরে বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে। ব্রিটিশ সরকার যশোর রোড নির্মাণ করেছিল যা বর্তমানে যশোর শহরকে কলকাতা এবং খুলনার সাথে সংযুক্ত করে রেখেছে। দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে চাঁচড়া জমিদার বাড়ি, গদখালি ফুলের বাগান, মধুসূদন দত্তের বাড়ি মধুপল্লী, কালেক্টরেট পার্ক, যশোর আইটি পার্ক, ইমাম বারা, মির্জানগর হাম্মামখানা, এগারো শিব মন্দির ইত্যাদি।
বৃহত্তর খুলনা জেলায় অনেক প্রাচীন মসজিদ আছে। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৩১০-১৩২৫) প্রথম খুলনা আগমন করেন। সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময়ে (১৩৪২-১৩৫৮) খুলনা অঞ্চলে মুসলমানদের আগমন ঘটে। তারপর হযরত খান জাহান আলী (রা.) (--------১৪৫৯) এ অঞ্চলে মুসলিম শাসন চালু করেন। সুলতান শাহ সুজার আমলে এ অঞ্চলের বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল জিয়াদখানা নামে। তার নাম ছিল সুন্দরবন। বৃহত্তর খুলনা জেলায় শ' শ' বছর আগে ইসলাম প্রচারক ও মুসলিম শাসক কর্তাদের আগমনের সাথে সাথে তাঁরা অনেক মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এ মসজিদগুলোর নির্মাণ কৌশল চমৎকার তাছাড়া স্থাপনা শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। এগুলোকে প্রাচীন মসজিদ বলা হয়। বৃহত্তর খুলনা জেলায় এ ধরণের কতটি মসজিদ ছিল তার সঠিক হিসেব পাওয়া যায় না। বেশ কিছু সংখ্যক প্রাচীন মসজিদ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিলীন হয়ে গেছে। কালের সাথে যুদ্ধ করে যে সব প্রাচীন মসজিদ টিকে আছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ বর্তমান খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাভিত্তিক তুলে ধরা হলো। বর্তমানে খুলনা জেলায় মোট মসজিদের সংখ্যা ১ হাজার ৩শত ৭৪টি। তার মধ্যে প্রাচীন মসজিদের সংখ্যা ৮টি। মসজিদকুড় মসজিদ : খুলনা মহানগরী থেকে ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে কয়রা উপজেলায় আমাদী গ্রামে মসজিদকুড় মসজিদ অবস্থিত। এটি নির্মাণ করেছিলেন হযরত খানজাহান আলীর (র.) একান্ত সহচর হযরত বুড়ো খাঁ (র.)। তিনি ধর্ম প্রচারের সাথে রাজ্য শাসন ও জমি পত্তন করতেন। মসজিদটি সুন্দরবনের অবিস্মরণীয় কীর্তি। এটি বর্গাকার। এর প্রত্যেক বাহুর দিকে ৫৪ ফুট ও ভিতরের দিকে ৪০ ফুট লম্বা। মসজিদের তিনটি প্রবেশপথ আছে। মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে আছে তিনটি মেহরাব। আছে চারটি মিনার। মসজিদটির বাইরের দেয়ালে দক্ষিণ পূর্ব ও উত্তর দিকে পোড়া মাটির চিত্র ফলকের দ্বারা অংকিত ছিল। মসজিদের মধ্যে ৪টি প্রস্তর স্তম্ভ আছে। আরো আছে ৯টি গম্বুজ। গম্বুজের নির্মাণ কৌশল খুবই চমৎকার।
আরশ নগরের মসজিদ : খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার আরশনগর গ্রামে একটি মসজিদ আছে। মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ইংরেজি ১৫০০ সালে। যতদূর জানা যায়, এ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন পিরে কামেল শেখ শাহ আফজাল (র.) তিনি হযরত খানজাহান আলীর (র.) সাথে ইসলাম প্রচারে এসেছিলেন। এক পর্যায়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মসজিদটি ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়। ১৯৮৩ সালে ধ্বংস স্তুপ থেকে মসজিদটি উদ্ধার করে সংস্কার করা হয়। মসজিদের ভিতর থেকে একটি শিলা লিপি উদ্ধার করা হয়। তাতে একটি হাদিস লেখা আছে। বর্তমানে শিলা লিপিখানি রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত আছে।
বেতকাশী মসজিদ : কয়রা উপজেলায় বেতকাশি গ্রামে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল হযরত খানজাহান আলীর (র.) সময়ে। এটি নির্মাণ করেছিলেন তার একান্ত সহচর হযরত খালেক খাঁ (র.) মসজিদটি কারুকার্য খচিত করে নির্মাণ করা হয়েছিল।
সোলায়মান পুরের মসজিদ : পাইকগাছা উপজেলায় সোলায়মানপুর গ্রামে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল হযরত খানজাহান আলীর (র.) আমলে। এটি নির্মাণ করেছিলেন তার সাথে আসা এক শিষ্য হযরত বোরহান উদ্দিন খান (র.)। মসজিদটি খুবই সুন্দর ছিল।
আলাইপুরের মসজিদ : রূপসা উপজেলার আলাইপুরে একটি প্রাচীন মসজিদ আছে। মসজিদটি দেখতে খুবই চমৎকার। তবে মসজিদটি কে নির্মাণ করেছিলেন তার সঠিক ইতিহাস এখনো অনুদঘাটিত। তবে এটি খানজাহান আলীর (র.) সময় নির্মিত হয়েছে বলে বিজ্ঞজনেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
চিংড়া মসজিদ : ডুমুরিয়া উপজেলার চিংড়া গ্রামে একটি প্রাচীন মসজিদ আছে। মসজিদটি কে নির্মাণ করেছেন তার সঠিক তথ্য জানা যায় না। অনেকের ধারণা এ মসজিদটিও খানজাহান আলীর (র.) সময়ে নির্মিত হয়েছিল। এ মসজিদ নিয়ে অনেক অলৌকিক কথা শোনা যায়।
টাউন জামে মসজিদ : খুলনা মহানগরীর সবচেয়ে পুরানো মসজিদ টাউন জামে মসজিদ। এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৫৪ সালে। এটি ভৈরব নদের পাড়ে কেডি ঘোষ রোডের পূর্ব দিকে অবস্থিত। মসজিদটি দেখতে খুবই সুন্দর।
টুটপাড়া জামে মসজিদ : নগরীর টুটপাড়া বড় পুরানো জামে মসজিদটি ১৮৮০ সালে নির্মিত হয়। এ মসজিদটি দেখতে খুব সুন্দর।
বায়তুন নূর মসজিদ : নগরীর সবচেয়ে আধুনিক মসজিদ হচ্ছে বায়তুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্স। মসজিদটি ১৯৮০ সালের ২২ নবেম্বর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলামকে সভাপতি করে এই মসজিদ নির্মাণের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৯২ সালের ১৮ ডিসেম্বর তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এস. এম মোস্তাফিজুর রহমান মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ মসজিদে এক সাথে ৬ হাজার মুসল্লি নামায আদায় করতে পারেন। মহিলাদের জন্যও মসজিদটিতে আছে আলাদা নামাযের স্থান। এছাড়া মসজিদটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় আছে মাদরাসা ও ইসলামী পাঠাগার। মসজিদটির মিনার ১৩৮ফুট উচ্চতা।